আজ শনিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

যশোরের চৌগাছায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ না গেলেও জেনারেটরের তেল ক্রয়, তিন লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

খুলনা ব্যুরোঃ
যশোরের চৌগাছায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জেনারেটর তেলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে। হাসপাতালের জেনারেটর না চালিয়ে প্রায় লক্ষাধিক টাকার বিল উত্তোলনের সত্যতা মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চৌগাছা উপজেলার ৫০ শয্যা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ডাঃ লুৎফুন্নাহার লাকি যোগদানের পর থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছে মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল ভাউচার সংগ্রহ করে টাকা উত্তোলন করে পকেটস্থ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসতে থাকে বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। করোনাকালীন বিভিন্ন ব্যয়ের ভুয়া বিলের পরে এবার বেরিয়ে এসেছে ভুয়া ভাউচারে জেনারেটরের তেল উত্তোলনের অভিযোগ। অনুসন্ধানে সত্যতা মিলেছে।

জানা যায়, উপজেলার চৌগাছা ফিলিং ষ্টেশন থেকে ব্ল্যাংক ভাউচার সংগ্রহ করে তিনি প্রায় লক্ষাধিক টাকার জেনারেটরের তেলের টাকা উত্তোলন করেছেন। ফিলিং ষ্টেশনের ৩৫৭৭ নং ভাউচার ব্যবহার করে তিনি গত ২০/০৮/২০২০ ইং তারিখে ২০ লিটার পেট্রোল ১ হাজার ৭২০ টাকা, ২ লিটার লুজ মবিল ৬৪০ টাকা, ০১/০৩/২০২১ ইং তারিখে ৩৫৭৮ নং ভাউচার ব্যবহার করে ৫০ লিটার পেট্রোল ৪ হাজার ৩১০ টাকা, লুজ মবিল ৩ লিটার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ০৮/০৭/২০২০ ইং তারিখে ২৫৭৯ নং ভাউচারে ২০ লিটার পেট্রোল ১ হাজার ৭২০ টাকা, ০১/০২/২১ ইং তারিখে ৫০ লিটার পেট্রোল ৪ হাজার ৩১০ টাকা, লুজ মবিল ৩ লিটার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ১০/০৯/২০২০ ইং তারিখে ২০ লিটার পেট্রোল ১ হাজার ৭২০ টাকা, ১৮/১২/২০২০ ইং তারিখে ৩৫৮২ নং ভাউচারে ১০০ লিটার পেট্রোল ৮ হাজার ৬০০ টাকা, ২ লিটার লুজ মবিল ৮৬০ টাকা, ০২/০৫/২০২১ ইং তারিখে ৫৩৫ নং ভাউচারে ৪৫ লিটার পেট্রোল ৩ হাজার ৮৭৯ টাকা, ২ লিটার লুজ মবিল ৯৫০ টাকা, ০১/০৬/২০২১ ইং তারিখে ৫৩৬ নং ভাউচারে ৪০ লিটার পেট্রোল ৩ হাজার ৪৪৮ টাকা, ০১/০৪/২০২১ ইং তারিখে ৫৩৮ নং ভাউচারে ৪৫ লিটার পেট্রোল ৩ হাজার ৮৭৯ টাকা উত্তোলন করেছেন। ২০২০ সালের ১ লা জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১ মে পর্যন্ত তিনি ৩৩ হাজার ৬১৮ টাকার জ্বালানি পেট্রোল ও ৮ হাজার ৪০ টাকার লুজ মবিলের টাকা পকেটস্থ করেছেন বলে সত্যতা পাওয়া গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো জেনারেটর চালানো হয় না। শুধুমাত্র রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার হাসপাতালে অপারেশন করা হয়। অপারেশনের সময় ব্যতীত কোনো জেনারেটর চালু করা হয় না। হাসপাতালের রোগীরা বিদ্যুৎ চলে গেলে নিজস্ব টর্চ, মোমবাতি অথবা চার্জার লাইট ব্যবহার করেন। আর অপারেশনরে সময় বিদ্যুতও তেমন যায় না। অপারেশন থিয়েটারে যে জেনারেটরটি ব্যবহার করা হয় সেটিতে ঘণ্টায় ১ লিটার জ্বালানী পেট্রোল লাগে। তাহলে জেনারেটর চালু না করে এতো জ্বালানী তেল উত্তোলন কিভাবে সম্ভব এটা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে হাসপাতাল চত্বরে।

উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন কর্মকর্তা জানান চৌগাছায় তেমন কোন লোড শেডিং নেই। সারাদিনে ১ ঘণ্টার লোড শেডিং ও থাকে না। আর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত জরুরি কাজ ছাড়া লোড শেডিং দেওয়া হয় না। যদি ঠিকাদাররা কাজ করে তাহলে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। সেটাও বন্ধের দিন। গত ১৮/১২/২০২০ ইং তারিখে ৩৫৮২ নং ভাউচারে ১০০ লিটার পেট্রোল ৮ হাজার ৬০০ টাকা উত্তোলন করায় সন্দেহ হলে ডিসেম্বর মাসের লোড শেডিং এর পরিমাণ জানতে চাওয়া হলে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তা পাওয়ার হাউজের রেজিস্টার দেখে জানান, গত ডিসেম্বর মাসে ২০ ঘণ্টা লোড শেডিং ছিল। ২০ ঘণ্টা লোডশেডিং ১ মাসে ১০০ লিটার জ্বালানি পেট্রোল উত্তোলন নিয়ে হাসপাতালের কর্মচারীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

উল্লেখ,এর আগে এই স্বাস্থ্যকর্মকর্তার অর্থ অত্মসাত নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে ঘটনার বিষয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আগের সংবাদ হলো- ভুয়া বিলে লাখ লাখ টাকা তুলেছেন হাসপাতালের কর্মকর্তা

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তিনি যে বিল ভাউচার দেখিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের তথ্য দিয়েছেন সব ভাউচার ভুয়া। ভাউচার নাম্বার নিয়ে চৌগাছা ফিলিং ষ্টেশনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের তারিখ বসিয়ে যে বিল ভাউচার দিয়েছেন। সেই ভাউচার বইটি গত জুন মাসে ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে তিনি কিভাবে ২০২০ সালের তারিখ বসিয়ে তথ্য দিলেন এটি ফিলিং ষ্টেশনে কর্মচারীদের বোধগম্য নয়। তাছাড়া ৫৩৫, ৫৩৬ ও ৫৩৮ নং ভাউচার বই ২০১৮ সালে ব্যবহৃত হয়েছে।

ফিলিং ষ্টেশনরে ম্যানেজার জানান, গত মাসে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী টিটো নামের একজন কয়েকটি ভাউচার নিয়ে জান। বলেন মোটর সাইকেলে তিনি যে তেল নিয়েছেন সেটার ভাউচার করবেন। ফিলিং ষ্টেশন কর্তৃপক্ষ আরও নিশ্চিত করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক মাসে কখনো ১০০ লিটার তো দুরের কথা ১০ লিটার তেলও নেয়নি। জেনারেটরের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ৫ লিটার পেট্রোল নিয়ে যান। লুজ মবিলের বাজার মূল্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ১৮০ টাকা দরে মবিল বিক্রয় করি। এটি আকাশ কুসুম কখনোই ৪৫০ টাকা লিটার মবিল বিক্রয় করি না।

হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রাঁধুনি টিটো কিছুদিন আগে বলেন- ম্যাডাম জেনারেটরের তেলের বিল করতে বলেছে। এরপর আমি প্রায় ৩৩ হাজার টাকার বিল করে দিয়েছি। এ বিষয়ে হসপাতালের রাঁধুনি টিটো বলেন, ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করেন। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। আমি চাকুরী করি ম্যাডাম যেটা বলেন আমি সেটা করতে বাধ্য।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ লুৎফুন্নাহার বলেন, সব অভিযোগ মিথ্যা। হাসপাতালে কোন অনিয়ম দুর্নীতি নেই। সকলকে সাথে নিয়েই আমি উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরো সংবাদ

ফেসবুকে খবর২৪ বিডি ডট নেট