আজ শুক্রবার, ৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক আলিমুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগঃ প্রকল্পের স্কিম থেকে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা

ফকির শহিদুল ইসলামঃ
মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ৪শ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোঃ আলিমুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ থাকার পরেও তাকে পদোন্নতি দিয়েছে মৎস্য ও প্রানী সম্পদ মন্ত্রনালয়। কোন সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন অভিযোগ তদন্তাধীন বা বিচারাধীন থাকলে তাহা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ঐ কর্মকর্তা/কমর্চারীর পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু আলিমুজ্জামানের ক্ষেত্রে ঘটেছে অন্যরকম। দুর্নীতি দমন কমিশনে তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরেও তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া মস্ত্রনালয় যে কোন সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীকে পদোন্নতি দেয়ার পূর্বে দুদক সহ অভিযোগ তদন্তকারী যে কোন দপ্তরে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন অভিযোগ আছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রানী সম্পদ মন্ত্রনালয় থেকে দুদকের নিকট জানতে চাওয়া হয়েছিলো আলিমুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আছে কিনা। কিন্ত দুদকের সিনিয়র সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত-০০.০০.০০০০. ০০০.০৬.০০১.১৯.৬৬০,তাং-০৮ডিসেম্বর-২০২০ স্মারক মুলে মৎস্য ও প্রানী সম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিবকে জানিয়ে দেন ‘এই কর্মকর্তার নামে দুদকে কোন অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন বা তদন্তাধীন নেই বলে ছাড়পত্র দেয়া হয় । অথচ দুদকেরই বগুড়া জেলা সমন্বয় অফিসের উপ পরিচালক মনিরুজ্জামান বরাবর ১ সেপ্টেস্বর-২০১৯ তারিখে আলিমুজ্জামানের ঘুষ গ্রহন সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগি ওয়াহিদুল ইসলাম। আর উক্ত অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রমও অদ্যবধি চলমান রয়েছে। এবিষয়টি চিরন্তন সত্য হওয়া সত্ত্বেও দুদকের উর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা কেন তা সরাসরি অস্বীকার করলেন তা বোধগম্য নয়। তবে এর পেছনেও ঘুষ দুর্নীতির মহোৎসব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। গুনজন রয়েছে আলিমুজ্জামান দুদকে তার বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোন এক কর্মকর্তাকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে অভিযোগের ফাইলটাই নাকি গায়েব করিয়ে ফেলেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক আলিমুজ্জামান চৌধুরী বগুড়া জেলাধীন উক্ত প্রকল্পের কাজ চলাকালনী সময়ে বগুড়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উপকারভোগিদের নিকট থেকে স্কীম প্রতি নির্দিষ্ট হারে ঘুষ গ্রহন করেন। এতে উপকারভোগি মৎস্যচাষীদের একজন ওয়াহিদুল ইসলাম ৮লাখ টাকা ঘুষ প্রদানের কথা উল্লেখ করে আলিমুজ্জামানের বিরুদ্ধে বগুড়া জেলাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের সমস্বয় অফিসে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। কমিশনে অভিযোগের ক্রমিক নং-১১৩, তাং- ১ সেপ্টেম্বর-২০১৯। শুধু বগুরা জেলাই নয় যে সকল জেলা ,উপজেলায় জলাশয় খনন প্রকল্প রয়েছে প্রায় প্রতিটি স্কিম থেকে সংশ্লিষ্ঠ জেলা মৎস্য দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ আদায় করেন । প্রকল্পের প্রথম ফেজের খননের ১ম,২য় ও ৩য় স্কিমগুলো স্ব স্ব উপজেলায় একই ব্যাক্তিকে লাখে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে শ্রমিক মজুরীর কাজ দিয়ে প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামান চৌধুরী ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় শতকোটি টাকা ।
দুদকের বগুড়া জেলা সমন্বয় অফিসের উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান অভিযোগটি তদন্তের পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়েও প্রেরন করেন। দুদকের প্রধান কার্যালয় অভিযোগটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খান স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৫০৩.২৬. ৫৩৫. ১৯-৪৬২৬০, তারিখ-২৭নভেম্বর-২০১৯ এর মাধ্যমে মৎস্য ও প্রানী সম্পদ মন্ত্রলায়ের সচিব বরাবর প্রেরণ করেন। সচিবের নির্দেশক্রমে মন্ত্রলায়ের মৎস্য পরিকল্পনা-২ এর সহকারী প্রধান হরেকৃষ্ণ অধিকারী কর্তৃক স্বারক নং ৩৩.০০.০০০০.১৩৬.১৪. ০১৫.১৮-৩৫৩,তাং-৮ডিসেম্বর-২০১৯ এর মাধ্যমে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি তদন্তের জন্য প্রেরণ করেন।

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পরিচালকের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন হতে দুটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। উত্থাপিত বিষয়ে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করে পরিচালকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি তদন্তপূর্বক মতামত সহ প্রতিবেদন ১মাস সময়ের মধ্যে মন্ত্রনালয়ে প্রেরন করতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের গঠিত ৩ সদস্যের কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উক্ত তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে একটি মনগড়া প্রতিবেদন মৎস্য ও প্রানী সম্পদ মন্ত্রনালয় সহ ইহার অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালযের সচিবকেও প্রেরণ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষনে দেখা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অভিযোগটি তদন্তের জন্য উপ-পরিচালক (অর্থ ও পরিকল্পনা) খন্দকার মাহবুবুল হকে সভাপতি, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (রিজার্ভ) মো: জিয়া হায়দার চৌধুরী ও সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) মো: মাহবুব উল হককে সদস্য করে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেন। উক্ত কমিটির সদস্যরা অভিযুক্ত আলিমুজ্জামানের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে অভিযোগের মুল বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে একটি একতরফা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

যা প্রতিবেদনের প্রতিটি শব্দে শব্দে দৃশ্যমান। কারন অভিযোগকারী ওয়াহিদুল ইসলাম পরিচালক আলিমুজ্জামানের প্রেরিত মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ, প্রো: মো: কামরুল হাসান চৌধুরী, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড ফরিদপুর শাখার একাউন্ট নং-০৪৯১১১০০১৬৮০৭৩ এর মাধ্যমে বগুড়া থেকে ৫ লাখ ও নগদ ৩ লাখ, মোট ৮ লাখ টাকা ঘুষ প্রদান করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু তদন্তে ৫ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি সত্য বলে প্রমানিত হলেও পরিচালক আলিমুজ্জামানকে রাখা অপরাধের বাইরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পরিচালক আলিমুজ্জামান তার প্রেরিত একাউন্টের মাধ্যমে অভিযোগকারী ওয়াহিদুল ইসলামের নিকট থেকে ৫ লাখ গ্রহন করেছেন ঠিকই, তবে এটা ঘুষের টাকা ছিলোনা, এই টাকাগুলো পরিচালক আলিমুজ্জামান তার কোন এক আত্মীয়কে মেয়ের বিয়ের সময়ে হাওলাদ দিয়ে ছিলেন, আর ওয়াহিদুল ইসলামের মাধ্যমে ঐ আত্মীয় উক্ত টাকা ফেরত পাঠিয়েছিলেন মাত্র।

তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে পরিচালক আলিমুজ্জামানের ঐ আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, সে কখনোই আলিমুজ্জামানের কাছ থেকে ৮লাখ হাওলাদ হিসেবে গ্রহন করে নাই, আলিমুজ্জামানের এমন বক্তব্য সম্পূর্ন মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। অথচ তদন্ত কমিটি ওই আত্মীয়ের কোন বক্তব্যই গ্রহন করেনি। তদন্ত কমিটি কেন আলিমুজ্জামানের কথিত আত্মীয়ের বক্তব্য গ্রহন করেনি তা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একটি পরিপূর্ন সঠিক তদন্ত হলে আলিমুজ্জামানের ওই আত্মীয়ের বক্তব্য প্রতিবেদনে থাকতো সবার আগে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষকদের মতে, নিজের নামে ব্যাংক একাউন্ট থাকতে আলিমুজ্জামান কেন অন্যের একাউন্টে নিজের টাকা লেনদেন করলেন? টাকাগুলো কি তাহলে অবৈধ সোর্স থেকে অর্জিত ছিলো। একজন সরকারী কর্মকর্তার কয়টি ব্যাংক একাউন্ট থাকতে পারে, অন্যের একাউন্টে অর্থ লেনদেন করা মানে আয়কর ফাঁকি দেয়ার ব্যবস্থা রাখা।

আলিমুজ্জামানের আয়কর রিটার্নে এই টাকার হিসাব বিবরনী উল্লেখিত আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিলো। শুধু মাত্র এই ৮ লাখ টাকাই নহে, আলিমুজ্জামানের উল্লেখিত ঐ একাউন্টে ২মাসের ব্যবধানে অন্তত ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে, এই টাকা গুলো কোন উৎস থেকে জমা হয়েছিলো, টাকার প্রকৃত মালিক কে ছিলো, টাকা গুলো আয়কর রিটার্ন বিবরনীতে উল্লেখিত ছিলো কিনা ইত্যাদি বিষয়ে প্রকৃত তদন্ত করাই তদন্ত কমিটির আসল কাজ ছিলো।

অথচ এমন একটি অসম্পূর্ন তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রনালয়ইবা কিভাবে গ্রহন করেছে তা নিয়েও অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া আলিমুজ্জামান অন্যের একাউন্টে নিজের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছে এমনটাই তো প্রতিবেদনে প্রমানিত।

আলিমুজ্জামানের বক্তব্য ছিলো তার আত্মীয় তার নিকট থেকে ৮ লাখ টাকা হাওলাদ নিয়েছিলেন, এর সত্যতা প্রমান করার জন্য তদন্ত কমিটি ঐ আত্মীয়ের বক্তব্য গ্রহন করলেই পারতেন। কিন্তু তারা আত্মীয়ের সাথে কথা বলার প্রয়োজন বোধই মনে করেননি। আলিমুজ্জামান যাকে আত্মীয় হিসেবে দাবী করেছেন তিনি ছিলেন বগুড়া জেলার মৎস্য কর্মকর্তা রওশন আরা বেগম। খুব সহজেই তার জিজ্ঞেস করতে পারতেন তদন্ত কমিটির কর্মকর্তরা। অথচ এই রওশন আরা বেগম বলেছেন, আলিমুজ্জামানের নিকট থেকে টাকা হাওলাদ নেয়ার কথাটি সম্পূর্ন মিথ্যা, তার সাথে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি।

দুদকের বগুড়া জেলা সমন্বয় অফিসের উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের পিডি আলীমুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তবে ইহার তদন্ত কার্যক্রম এখনো শেষ হয় নাই। অভিযোগ নং-১১৩

এব্যাপারে মৎস্য অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক (সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প) মাহাবুবুল হক বলেন, তদন্ত কার্যক্রমে বগুড়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রওশন আরা বেগমের বক্তব্য নেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।  সুত্র- অপরাধ বিচিত্রা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরো সংবাদ

ফেসবুকে খবর২৪ বিডি ডট নেট