আজ রবিবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে নরসিংদীর লটকন

নরসিংদী প্রতিনিধিঃ নরসিংদীর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে একসময়ের অপ্রচলিত ফল “লটকন”। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় লটকনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে দ্বিগুণ। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ায় লটকন চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

চলতি মৌসুমে নরসিংদীর ১৬০০ হেক্টর জমি থেকে ২৪ হাজার মেট্রিকটন লটকনের ফলন পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ। উৎপাদিত এ লটকন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬৮ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নরসিংদীর উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লটকন এক প্রকার দেশীয় অপ্রচলিত ফল, যা অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ওষধি গুণে ভরপুর। এর ইংরেজি নাম হলো Burmese grape ও বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea sapida এর বৃক্ষ মাঝারি আকারের চির সবুজ। ফল গোলাকার, পাকলে এর রঙ হলুদ বর্ণ ধারণ করে। লটকন অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ভিটামিন বি-২ সমৃদ্ধ একটি ফল। এই ফলে চর্বি অত্যন্ত কম। তাছাড়া এ ফলে কোন শর্করা না থাকায় সকল বয়সের মানুষ কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫০ বৎসর পূর্ব থেকে নরসিংদীর মানুষ লটকনের সাথে পরিচিত। তখন লটকন ছিল কেবলই একটি অবহেলিত জংলি ফল। ধীরে ধীরে এর স্বাদ, ভিটামিন ও পুষ্টি গুনের সাথে পরিচিত হয়। একসময় পুষ্টিকর ফল হিসেবে লটকন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং নরসিংদীর মানুষের অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়। প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে বেলাবো উপজেলার লাখ পুর গ্রামে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ভাবে লটকনের আবাদ শুরু হয়।

এরপর থেকে বেলাবো ও শিবপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের লাল মাটির এলাকায় লটকন চাষের প্রসার ঘটতে থাকে। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য ও পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ লটকনের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ব্যাপক চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই লটকনের চাষ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বেলাবো উপজেলায় গত ৩০ বছরে বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

দুই উপজেলায় প্রায় প্রতিটি পরিবারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন লটকন। লটকন চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি বেকার সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে অনেকে। শিবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিন সাদেক বলেন, শিবপুর উপজেলার লাল রঙের উঁচু মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া রায়পুরা উপজেলার কিছু কিছু এলাকার মাটিও লটকন চাষের উপযোগী।

গাছের গোড়া থেকে শুরু করে প্রধান কাণ্ড গুলোতে ছড়ায় ছড়ায় ফলন হয় এই লটকনের। নরসিংদীর লটকন খেতে সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এর কদর বাড়ার পাশাপাশি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে লটকন এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে নরসিংদীর এই সুস্বাদু ফল লটকন।

লটকন ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে জেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরার মরজাল ও শিবপুর উপজেলা সদরে বসেছে লটকনের বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে এ সব লটকন হাতবদল হয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশের বাজারেও। অনেকে সরাসরি জমি থেকে সরবরাহ করে রপ্তানি করছেন বিদেশের বাজারে।

জয়নগর গ্রামের রাজীব আহমেদ বলেন, লটকন হলো কম খরচে লাভজনক একটি ফল। লটকন বাগান শুরু করতে প্রথমে খরচ বেশি হলেও পরবর্তীতে বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না।

একই গ্রামের প্রবীণ লটকন চাষি আব্দুল হাই মিয়া বলেন, স্থানীয় বাজার ছাড়াও লটকনের ফলন ধরার পর জমিতেই পাইকারি বিক্রি করে দেয়া যায়। পাইকাররা এসব লটকন দেশে বিদেশের বাজারে পাঠিয়ে থাকেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, লটকন চাষ বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চারা উৎপাদন করাসহ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়াতে কৃষকরা লটকনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ১৬০০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিকটন ফলন হিসেবে লটকনের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার মেট্রিকটন। যার পাইকারি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরো সংবাদ

ফেসবুকে খবর২৪ বিডি ডট নেট